দেশে বর্তমানে আসবাবের বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার। এ শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের। বৈশ্বিকভাবে এ বাজার ৬২০-৬৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো। যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ শিল্পে বাংলাদেশের রফতানি আয় ৭ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। ২০৩০ সাল নাগাদ আসবাবের বৈশ্বিক বাজার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলা হচ্ছে। অথচ সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাক শিল্পের পর এ খাত থেকে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য প্রয়োজন সরকারের নীতি সহায়তা ও সমন্বিত প্রচেষ্টা।
রাজধানীর পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিসিএফসি) গতকাল আসবাবসংক্রান্ত এক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। ‘বাংলাদেশের আসবাব শিল্প: রফতানির সম্ভাবনা উন্মোচন’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। সহায়তায় ছিল বাংলাদেশ ফার্নিচার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফইএ)। সেমিনারের মিডিয়া পাটর্নার ছিল বণিক বার্তা।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি খাতেই অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বন্ডেও অনেক জটিলতা আছে। বন্ডের অপব্যবহার হচ্ছে, এটাও বাস্তবতা। পোশাক শিল্প বর্তমানে ৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করছে। এ খাত এতদূর আসার পেছনে সরকারের অনেক সহায়তা রয়েছে। আসবাব শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারের সহায়তার পাশাপাশি কারিগরি উন্নতিও দরকার।’
সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু ইউসুফ। তিনি বলেন, ‘আসবাবের বৈশ্বিক বাজারে আমাদের অংশীদারত্ব খুবই নগণ্য। এখনো আমরা শূন্য দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করছি। দেশে দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে ও মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে স্থানীয় চাহিদাও অনেক।’
আসবাবের বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিযোগিতা, যা বৃদ্ধি করতে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক আবু ইউসুফ।
বিএফইএর মহাসচিব সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সবাই সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রফতানির বিষয়টা বিবেচনা করলে আমরা নিঃসন্দেহে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারব। ফার্নিচার অ্যাসোসিয়েশন সেজন্য সবার কাছে জোর প্রত্যাশা ও দাবি করছে।’
সেমিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কাস্টমস, রপ্তানি, বন্ড ও আইটি) মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমরা যদি বিশেষ একটা খাতকে গুরুত্ব দিই, তাহলে সেটা টেকসই হবে না এবং উন্নয়নও হবে না। এজন্য অন্যান্য খাতের প্রচারণাও চালানো উচিত।’
গার্মেন্টস খাতে বাংলাদেশ ভালো করে, কিন্তু আসবাব খাত এক্ষেত্রে আলাদা—উল্লেখ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ডিজাইনের ডিন অধ্যাপক ড. ফুয়াদ এইচ মল্লিক বলেন, ‘আসবাবের নকশা করতে জ্ঞান লাগে। এ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দেয়ার মতো পর্যাপ্ত শিক্ষক দেশে নেই। বাইরে থেকে ডিজাইনার ও শিক্ষক এনে প্রশিক্ষণ দেয়া অনেক ব্যয়বহুল। সরকার এক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে।’
বুয়েটের বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ শরিফ বলেন, ‘দেশে সাধারণত অন্যের ডিজাইন নকল করে নিজেদের পণ্যে ব্যবহার করতে দেখি। এভাবে বিভিন্ন নকশা নকল করে চললে টিকে থাকা যাবে, কিন্তু কখনো এ খাতে নেতৃত্ব দেয়া যাবে না। আমরা যদি নেতৃত্ব দিতে চাই নকশা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। এ নকশার সঙ্গে গুণগত মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচামাল থেকে পণ্যের শেষ পর্যন্ত সবকিছু মানসম্মত হতে হবে। এটা সমন্বয় করতে হবে।’
আসবাবের জন্য কাঠ আমদানির পরামর্শ দিয়ে বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক মো. মঈনুদ্দিন খান বলেন, ‘দেশে কাঠের চাহিদার ৭০ ভাগ আসে গ্রামীণ কাঠ থেকে। ২৬ ভাগ আসে কিছু সামাজিক বনায়ন থেকে। বাকি ৪ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। সেখানে আমাদের আমদানি বাড়ানোরও সুযোগ আছে। সরকারি বিধিমালা অনুসারেই সে সুযোগ রয়েছে।’
ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্যে আমদানি করতে না পারলে আমরা চায়না ও ভিয়েতনাম হতে পারব না, এমন মন্তব্য করেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আসবাব তৈরিতে যেসব জিনিসপত্র লাগে সব সাশ্রয়ী মূল্যে পেলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। বন্ডে যদি জিনিসপত্র আনা যায়, তাহলে আমরা জিততে পারব। সরকারি সহায়তা ছাড়া বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন। এজন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন হবে।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফইএর পরিচালক দেওয়ান আতিফ রশিদ। তিনি বলেন, ‘রফতানি প্রতিযোগিতায় সফলতা অর্জনে কমপ্লায়েন্স সমস্যা, দক্ষতা ও প্রযুক্তি ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিতি ও সরকারের নীতিসংক্রান্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব মোকাবেলায় সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে রফতানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।’
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন। উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন এসকেবি স্টেইনলেস স্টিল মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সাইফুর রহমান, কেসি ইন্টেরিয়র ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাউসার চৌধুরী এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের রফতানি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক সালাহউদ্দিন শিকদার।